
নিম্ন-কার্বন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের রূপান্তরকে শ্রমিকবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি শ্রমিক সুরক্ষা, সবুজ কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ পরিকল্পনায়।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় ‘অ্যাডভান্সিং জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপে রোডম্যাপটি উপস্থাপন করা হয়। এতে জ্বালানি, পরিবহন, নির্মাণ, কৃষি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পপ্রক্রিয়া ও পণ্য ব্যবহারের ছয়টি খাতে ৬৯টি সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিটি কার্যক্রমের জন্য সম্ভাব্য ব্যয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য সাফল্যের সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদপ্তর আয়োজিত এ সংলাপে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং কারিগরি সহায়তা দেয়। উদ্যোগটি সুইডেনের অর্থায়নে আইএলও-সিডা গ্লোবাল পার্টনারশিপের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম কপ৩১-এর আগে ‘জাস্ট ট্রানজিশন’কে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ বলেন, নিম্ন-কার্বন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের রূপান্তর অবশ্যই ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। শ্রমিক ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার পাশাপাশি শোভন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
রোডম্যাপ তৈরিতে বাংলাদেশের ১৪টি জাতীয় নীতিমালা ও পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনডিসি ৩.০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এসব নথিতে থাকা ২৫৮টি সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি থেকে ৩৩টি অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করে তা ৬৯টি কার্যক্রমে রূপ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ২৫০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার প্রশিক্ষণ, অনুদান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সরাসরি ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ১ দশমিক ৫৯৭৫ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যিক অর্থায়ন ও উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে আইডকলের মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নের আনুমানিক মোট ব্যয়ের প্রায় ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
আয়োজকদের মতে, ব্যয় নির্ধারিত ও প্রকল্প মূল্যায়নের উপযোগী এই কাঠামো আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন প্রস্তাব উপস্থাপনে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে।
‘জাস্ট ট্রানজিশন’ কাঠামোর কেন্দ্রে রাখা হয়েছে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃদক্ষতা অর্জন, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং শ্রমিকদের অংশগ্রহণ। কারণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে কিছু প্রচলিত কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কপ৩১ সামনে রেখে এখন বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্প, নতুন দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষায় রূপ দেওয়া।
বাংলাদেশের জন্য ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ এখন শুধু নীতিগত অঙ্গীকার নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য একটি বিনিয়োগ ও কর্মপরিকল্পনায় রূপ নিচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :