
মোঃ জাহাঙ্গীর আলম অজয় :: বিশ্বের বৃহত্তম জোয়ার-ভাটার ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্লাস্টিকদূষণেরও বড় ঝুঁকিতে পড়েছে। নদী ও সাগর হয়ে প্রতিনিয়ত বনে ঢুকছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, মাছ ধরার জালের বয়া, প্যাকেট, কর্কশিট, স্যান্ডেল ও লাইটারসহ নানা ধরনের বর্জ্য। এসব বর্জ্যের একটি অংশ জোয়ার-ভাটার স্রোতে ছড়িয়ে পড়ছে বনের খাল, নদী ও পলিতে।
সুন্দরবননির্ভর মানুষের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে দূষণের এই চিত্র। বাগেরহাটের মোংলার ৬৫ বছর বয়সী জেলে খবির শেখ দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে মাছ ধরেন। তাঁর ভাষ্য, বন বিভাগ মাছ ধরার পাস নেওয়ার সময় পলিথিন বা প্লাস্টিকজাতীয় কোনো পণ্য না নিতে বারবার সতর্ক করে। কিন্তু বনে ঢোকার পর বিভিন্ন স্থানে এসব বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়।
খবির শেখ বলেন, “জালে মাছ না পেলেও বনের বিভিন্ন জায়গায় প্লাস্টিকের বোতল, জালের বয়া, প্লাস্টিকের প্যাকেট, কর্কশিট, স্যান্ডেল ও গ্যাসলাইট দেখতে পাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা, বনজীবী, পর্যটন ব্যবসায়ী ও বন কর্মকর্তারাও সুন্দরবনের এই দূষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্লাস্টিক বর্জ্যের চাপ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সুন্দরবনের আশপাশের নদ-নদীতে প্লাস্টিকদূষণের উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক জার্নাল Emerging Contaminants-এ প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের গবেষণায় ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশের ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতার পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ক্যাডমিয়াম ও সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
গবেষকেরা প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৭০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। এসব কণার মধ্যে পলিইথিলিনের পরিমাণ প্রায় ২৩ শতাংশ এবং পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ। একই সঙ্গে সিসা, কপার, নিকেল, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর পলি ও পানিতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার পাশাপাশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২২ সালে Journal of Hazardous Materials Advances-এ প্রকাশিত বাংলাদেশ ও ভারতের গবেষকদের যৌথ গবেষণাতেও সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে প্লাস্টিক এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের নদীগুলো থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবেশ করছে বলেও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়।
গবেষকদের সতর্কতা হলো, এসব বর্জ্য শুধু পানি ও পলিতে আটকে থাকছে না। জোয়ার-ভাটার স্রোতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করছে।বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করা সুন্দরবন ২০০টিরও বেশি দ্বীপজুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ১৫টি প্রধান নদী এবং ৪০০টি আন্তঃসংযুক্ত জোয়ার-ভাটার জলপথ এই বনকে ঘিরে রেখেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দুই দেশের ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।
সুন্দরবনে প্লাস্টিকদূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করা যায় না বলে মনে করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, নদী ও সাগরের মাধ্যমে বাইরে থেকে আসা বর্জ্যও দূষণের বড় উৎস। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শহর ও গ্রামাঞ্চলের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সাধারণ সম্পাদক শাহ জামান খান পপুল বলেন, তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকার পর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংগঠনটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়। মাত্র তিন দিনে সেখান থেকে ১৫ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়।
তিনি বলেন, “প্লাস্টিকের বোতল, স্যান্ডেল, লাইটার, বয়া, কর্কশিট ও পলিথিনসহ নানা ধরনের বর্জ্য পাওয়া গেছে। এসব বর্জ্য শুধু পর্যটকদের নয়। নদী ও সাগর দিয়েও বর্জ্য সুন্দরবনে ঢুকছে।”
পপুল বলেন, ট্যুর অপারেটররা পর্যটকদের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। তবে সুন্দরবন রক্ষায় শুধু পর্যটন খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ যথেষ্ট নয়। সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনে পর্যটন পরিচালনার জন্য প্রায় ৭০টি জাহাজ রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত পর্যটকের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পর্যটন বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্লাস্টিকদূষণ মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মঙ্গলবার বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক পরামর্শসভায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য পৃথককরণ, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত কর্মসূচির আহ্বান জানানো হয়।
সভায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং তরুণদের একযোগে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
খুলনার আঞ্চলিক বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের দূষণ রোধে বন বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যুবসমাজ ও বনজীবীদের সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে তিনি বলেন, “সবকিছুই নির্ভর করে সবার সচেতনতার ওপর। সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই বনকে রক্ষা করতে না পারলে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।”
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহের পাশাপাশি দূষণের উৎস বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও উপকূলীয় এলাকায় কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নদীপথে বর্জ্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সুন্দরবনে প্লাস্টিকদূষণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :